একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা একদিকে ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের নির্যাস, অন্যদিকে ছিল স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। মাত্র ১৮-১৯ মিনিটের ভাষণ। এই স্বল্প সময়ে তিনি ইতিহাসের পুরো ক্যানভাসই তুলে ধরেন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সবই এসেছে ওই ভাষণে। এ ভাষণের পরপরই দেশের মুক্তিকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় কঙ্ক্ষিত মুক্তির লক্ষ্যে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সর্বশেষ দুটি বাক্য, যা পরে বাঙালির স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকনির্দেশনা ও প্রেরণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা’।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর একটি নিবন্ধে লিখেছেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন কিনা, এমন এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু নিউজউইকের এক সাংবাদিককে বলেছিলেন–‘আমরা তো সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশ্চিমাদের উপর নির্ভর করছে তারা বিচ্ছিন্ন হতে চায় কিনা।’ ওইদিন তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তবে এটাও সত্য, বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের পর গোটা বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকে বিভিন্ন জায়গায় পূর্ব পাকিস্তান শব্দ মুছে বাংলাদেশ লেখে। এ ভাষণের পর গোটা দেশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় চলতে থাকে। বস্তুত স্বাধীনতা ঘোষণার কিছু বাকি রাখেননি বঙ্গবন্ধু ওইদিন।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শুধু সামরিক পরাজয়ই হয়নি, তাদের ধর্মের নামে রাজনীতি, হানাহানি, হত্যা ও ধ্বংসের দর্শনেরও পরাজয় ঘটেছিল। এটি সম্ভব হয়েছিল সকল ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালিত্বের চেতনায় জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালিত্বের এই চেতনার প্রধান রূপকার, যার ভিত নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির এই ঐক্য পাকিস্তান ভেঙেছে, ধর্মের নামে রাজনীতির অমানবিক ধারণা ভেঙেছে। সে কারণেই পরাজিত পাকিস্তান এবং তাদের এদেশীয় দোসররা বাঙালির এই ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য বরাবরই তৎপর থেকেছে। এখনও তারা সক্রিয়। তাদের ওই তৎপরতারই ফসল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, যার পর ’৭২-এর সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলে বাঙালিত্বের চেতনার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে ধর্মকে। দুঃখজনক হলো, ’৭১-পূর্ববর্তী পাকিস্তানের পুরো সময় ধর্মীয় জিকির তুলে বাঙালির ঐক্য ভাঙতে সক্ষম না হলেও স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তারা সফল হয়। এর সুলুক সন্ধান করতে হবে।
ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে যে একটা দেশ এগোতে পারে না, তার নজির বিশ্বে যেমন বিরল নয়, তেমনি আজকের বাংলাদেশও তার প্রমাণ। একটা গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আমরা বরং পথ হারিয়েছি। আমাদের অর্থনীতি সংকটগ্রস্ত, শিক্ষা-সংস্কৃতি অঙ্গন শ্বাপদসংকুল, আর রাজনীতিও সংঘাতমুখর।
বাংলাদেশ যদি একটি আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, যদি আর্থসামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই কেবল পথ দেখাতে পারে। এ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথের অনন্য সোপান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এ ভাষণ একজন ব্যক্তি দিয়েছেন বটে, তবে তা ধারণ করে সেই সময় ঐকবদ্ধ সমগ্র জাতির আবেগ-অনুভূতি-স্বপ্ন। যে ভাষণ ইতোমধ্যে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তা আমাদের জাতীয় সম্পদ।
লেখক,
সৈয়দ আমিরুজ্জামান: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক
Leave a Reply