অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্জনে যদি আমরা একটু চোখ বুলিয়ে নিই, তাহলে স্পষ্ট দেখতে পাবো বাংলাদেশ কী কী পেয়েছে ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কী কী পেয়েছে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশ যা যা পেয়েছেঃ
মবঃ মব বাংলাদেশে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে শেষ পর্যন্ত কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়েছে ও জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে উল্লাসে মেতে ওঠার মতো কাজ করেছে উগ্রবাদীরা। কিন্তু সরকারের দিক থেকে তেমন কোনো শক্ত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। যার ফলে দিনে দিনে বেড়েছে মব। অনেকেই তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মবের জনক হিসেবেও উপাধি দিয়েছে।
জেল হত্যাঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জেলে আসামি মারা যাওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত যে কোনো সরকারের আমলের তুলনায় বেশি। এই আসামিদের মৃত্যুর সঠিক তদন্ত এখন পর্যন্ত করা হয়নি। অনেকের মতে, আওয়ামী নিধন করতেই সরকার জেলের ভেতরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করে আত্মহত্যা বা স্ট্রোক বলে চালিয়ে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরেকটি সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—তার আমলেই একমাত্র লাশ গিয়েছে কারাগারে আসামির সাথে সাক্ষাৎ করতে।
ফাঁসির আসামির প্যারোলে মুক্তির নিয়ম থাকলেও তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে হয়নি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যেখানে প্যারোলে মুক্তি মেলে না, আবার লাশ দাফনের ৩ দিন পরে সেই আসামির জামিন হয়ে যায়।
আইন-শৃঙ্খলাঃ স্বাধীনতার পরে এই প্রথম যেখানে পুলিশ হত্যার বৈধতা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (৫ই আগস্ট থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সকল অন্যায়কে বৈধতা দেয় আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা বিশ্বের আর কোনো সরকার এমন কাজ করেছে বলে আপাতত জানা নেই)। ফলে এখন পর্যন্ত পুলিশ সেভাবে কাজ করতে পারছে না, কারণ তাদের ভেতরে এখনো ভয় কাজ করছে।
ঋণঃ তথাকথিত স্বৈরাচার শেখের বেটির ১৫ বছর ৭ মাস শাসনামলে ঋণ ছিল ২ লক্ষ কোটি, যা বর্তমানে ২৩ লক্ষ কোটি (সব মিলিয়ে)।
বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকা। সূত্র বলছে গত ১ বছরে ১ টাকাও ঋণ পরিশোধ করেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কর্তৃপক্ষ বলছে ঋণের টাকা যদি এখনো (কিছু) না দেওয়া হয়, তাহলে রমজান ও সামনে গরমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
পদ্মা সেতুঃ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেতু, বাঙালির স্বপ্নের সেতু। গত ১৮ মাসে সেতু থেকে নির্ধারিত পরিমাণ টোল আদায় হলেও পদ্মা সেতুর কিস্তির টাকা দেওয়ার কোনো প্রমাণ আমরা এখনো দেখতে পাইনি। যদি কিস্তির টাকা না দেওয়া হয়, তাহলে সেই টাকা কোথায়? আর দেওয়া হলে তার কোনো তথ্য-প্রমাণ বা নিউজ নেই কেন?
টাকা ছাপানোঃ তথাকথিত স্বৈরাচার শেখের বেটির ১৫ বছর ৭ মাস শাসনামলে ৩ বার টাকা ছাপাতে হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮ মাসে তার সমপরিমাণ বা বেশি টাকা ছাপিয়েছে এবং নিজের ছাপানো টাকাতেও সে ১৩০৩ কোটি টাকা ঋণ রেখে যাচ্ছে আমাদের জন্য উপহার হিসেবে।
উন্নয়নঃ গত ১৮ মাসে কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন ছাড়া আর কোনো উন্নয়নমূলক কাজ দেখাতে পারেনি। কিন্তু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ, যা বিগত ১০–১৫ বছরের তুলনায় অতিরিক্ত এবং যা আগামী সরকারের জন্য বিপজ্জনক।
শিল্প খাতঃ দেশের শিল্প খাত ধ্বংস। প্রায় ৩৫০+ গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ, যার প্রভাবে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ ইতোমধ্যে বেকার। যার প্রভাব পড়েছে মুদি দোকান থেকে শুরু করে সরাসরি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা ব্যক্তি পর্যন্ত।
দেশের সংস্কৃতিঃ দেশের সংস্কৃতি আছে বলে মনে হয় না। কিছু করলেই সেটা ভারতীয় সংস্কৃতি হয়ে যায়। বহু শিল্পীকে মবের মতো পরিবেশে পড়তে হয়েছে। দেশের বহু সাংস্কৃতিক স্থানে হামলা করা হয়েছে। হামলার হাত থেকে ছায়ানট, মসজিদ, মন্দির, গির্জা—কোনো কিছুই রেহাই পায়নি।
খুন ও ধর্ষণঃ সর্বশেষ ৯ মাসে খুন হয়েছে ৩ হাজারের উপরে। ধর্ষণ হয়েছে অগণিত। দেশের রাস্তায় মানুষ নামতে বাধ্য হয়েছে “ধর্ষণ ঠেকাও” বলতে। শুধু রাজধানীতে ১ বছরে পাওয়া গেছে ৬৪৩ বেওয়ারিশ লাশ। এত লাশ কোথা থেকে আসলো? এই হত্যাগুলো কেন বা কারা করছে, তার কোনো শক্ত প্রমাণ সরকার দিতে পারেনি।
আগে নদীতে জাল ফেললে মাছ পাওয়া যেত, এখন অধিকাংশ দিন সকালে সবাই নিউজ পড়ে—নদীতে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ! অনেক লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়, কিন্তু অপরাধীর বিচার আর হয় না। ছোট্ট আসিয়ার কথা এখন বাংলাদেশ ভুলেই গিয়েছে। খুলনায় ১ বছরে খুনের সেঞ্চুরি হয়েছে। বাংলাদেশ দল ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করতে না পারলেও বাংলাদেশ হত্যা ক্ষেত্রে সেঞ্চুরি করতে পেরেছে—যা খুবই হতাশাজনক।
কোনোটিরই বিচার করতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
গত ১৮ মাসে সরকারি পরীক্ষার সার্কুলার বাদে সরাসরি নিয়োগ হয়েছে—এমন বহু কাজ আমরা দেখেছি। কিন্তু সমাধান আমরা কোনো কিছুরই পাইনি।
আওয়ামী লীগ সরকার বলেছিল আমরা ২ বছরের জন্য খাদ্য মজুত রেখে যাচ্ছি। বিগত ১৮ মাসে আমরা দেখেছি সরকারের বিভিন্ন অনুদানে শেখ হাসিনার নামে খাদ্যের বস্তা (খাদ্যসহ) প্রদান করা হয়েছে। সর্বশেষ ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রেস সচিব শফিকুর রহমান বলেছেন যে তারা ৬ মাসের খাদ্য মজুত রেখে যাচ্ছে, যা হিসাব ও তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ২ বছরের খাদ্যের অবশিষ্ট অংশ।
বিনিয়োগঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন বিনিয়োগ এসেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে। তাদের শুধু প্রেজেন্টেশন নাকি অনেক ভালো ছিল। কিন্তু বিদেশি কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ আসেনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নেন। সবাই বলেছিল তিনি নোবেলজয়ী, তার সঙ্গে আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের সকল দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে—এতে আমাদের জন্য অনেক ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।
ফলাফলঃ আমাদের সবুজ পাসপোর্টে এখন কোনো দেশ নাকি ভিসা দিতে চাচ্ছে না—এ কথা স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা নিজে বলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন জালিয়াতি; আমরা নাকি জালিয়াতিতে এগিয়ে, যার কারণে অন্য দেশ আমাদের ভিসা দিচ্ছে না। এখন একটি দেশের প্রধান যদি বলেন আমরা জালিয়াতি করি, তাহলে অন্য দেশ সেটি কেন বিশ্বাস করবে না? আর এই কথা যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশ্বাস করে, তাহলে প্রবাসীদের কী অবস্থা হবে? তিনি হয়তো ভুলে গেছেন তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন না; তিনি কথা বলছিলেন মিডিয়ার সামনে একটি দেশের নির্বাহী প্রধান হয়ে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার এত সুফল যে ভারত ইউরোপের ২৭টি দেশের সঙ্গে বিনা শুল্কে রপ্তানির অনুমতি পেলেও আমাদের নোবেলজয়ী স্যার তা পাননি। স্যারের প্রভু আবার আমেরিকা—তাদের ইচ্ছেতেই স্যার ক্ষমতায় বসেছিলেন—কিন্তু সেই আমেরিকাও আমাদের ওপর ভারতের চেয়ে বেশি শুল্ক রেখেছে, যার ফলে ক্রেতা কমছে, রপ্তানি কমছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারের তুলনায় অধিক মূল্য দিয়ে আমেরিকা থেকে গম কিনছি আমরা। অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি, যা অতি গোপনীয়।
কোন স্বার্থে আমরা অতিরিক্ত মূল্যে আমেরিকা থেকে পণ্য কিনবো? ডিপ স্টেট ২৯ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে ২৪-এর জুলাইয়ে বিনিয়োগ করেছিল—সেই টাকা উঠিয়ে দেওয়ার জন্যই কি এই অতিরিক্ত মূল্যে গোপনে করা চুক্তিগুলো? এই বিষয়ে হাজার প্রশ্ন করা গেলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির একটি বিশেষ শর্ত হলো এই চুক্তি নাকি গোপন রাখতে হবে; জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা যাবে না। যা আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কাছে রহস্যময় ও উদ্বেগের কারণ।
তিনি যে দেশে গেছেন, সেই দেশের প্রবাসীদের কপাল পুড়েছে। তিনি ইতালি গেলেন, দেখা করলেন সেখানকার মেয়রের সঙ্গে। ইতালিয়ান সরকার জানালো, সকল অবৈধভাবে প্রবেশকারী বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠাবে। সেই বিষয়টি আবার তিনি ও তার প্রেস সচিব সংবাদ সম্মেলন করে গর্বের সঙ্গে বলেন।
সাংবাদিকতার ওপর সরকারের প্রভাবঃ কোনো সংবাদ সরকারের বিরুদ্ধে গেলে তা পরক্ষণেই ওয়েবসাইট থেকে সরানো হয়েছে। বহু সাংবাদিক এখনো জেলে (শুধুমাত্র সরকারের সঙ্গে মতের অমিল হওয়ার কারণে)। সংবাদপত্রের অফিসে হামলা, ভাঙচুর, আগুন, লুটপাট—এমন কোনো অপরাধমূলক কাজ নেই যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে হয়নি।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা এখন এক ধরনের পাপ হয়ে গেছে। যে ব্যক্তি দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে, তাকে হয়ে যেতে হয় ভারতীয় দালাল।
ভারতবিরোধিতা ও ভারতের কাছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিক্রির অভিযোগঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান একটি অস্ত্র হলো ভারতবিরোধিতা করে জনগণের মনে নিজের জন্য সফট কর্নার তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সবার আগে ভারতের আদানি গ্রুপের টাকা দিয়েছে।
শেখ হাসিনা দেশ ভারতের কাছে বিক্রির চুক্তি করে রেখেছেন—এমন বহু কথা বলা হলেও, শেখ হাসিনার আমলে করা একটি চুক্তিও বাতিল করেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বরং শেখ হাসিনা বিনা যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে সাগরসীমা বৃদ্ধি করেছেন, ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছেন।
রোহিঙ্গাঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা খুব জোরে প্রচার করেছিলেন গত রমজানে যে আগামী ঈদ রোহিঙ্গারা তাদের দেশে গিয়ে করবে এবং ১ লাখ রোহিঙ্গাকে সঙ্গে নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে ইফতার করেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো কিছুদিন পর আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সৌদিতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
খেলাধুলাঃ বাংলাদেশের প্রাণের খেলা ক্রিকেট। অতীতের কোনো সরকার ক্রিকেটে এত রাজনীতি না আনলেও বর্তমান সরকার সরাসরি ক্রিকেট বোর্ডে হস্তক্ষেপ করেছে। এবং সর্বশেষ টি-২০ বিশ্বকাপে খেলতে যেতে দেওয়া হয়নি সরকারের ভারতবিরোধী রাজনীতির কারণে। তবে ক্রিকেট খেলতে না গেলেও অন্য সব খেলায় আবার ভারতে গিয়েছে বাংলাদেশ দল।
ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে বর্তমান ক্রিকেট বোর্ড। অতীতের সব খারাপ রেকর্ড ভেঙে এখন তারাই প্রথম স্থানে।
ত্রাণঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই দেশে ভয়াবহ বন্যা হয়। তৎকালীন সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ তহবিল থেকে ১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২ দিনের বেতন-ভাতা কেটে নেওয়া হয় এবং টিএসসিতে বর্তমান এনসিপি নেতারা প্রচুর টাকা উত্তোলন করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার সেই টাকা দিয়ে ১০টি মানুষের বাড়ি বা ঘর তৈরি করে দেয়নি। সেই টাকা হয়তো নতুন করে প্রধান উপদেষ্টার কল্যাণ তহবিলে পড়ে আছে।
সবচেয়ে আলোচিত হত্যা ওসমান হাদির হত্যারও বিচার করতে পারেনি সরকার।
বাংলাদেশের বা পৃথিবীর বুকে একমাত্র সরকার আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার আমলে মবের শিকার হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিটি কোনো বিচারই পায়নি; বরং তার ব্যক্তিগত জীবনে অর্জিত একাডেমিক সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
বাংলাদেশে অনেক শাসক এসেছে, কিন্তু কোনো শাসক কারো ব্যক্তিগত অর্জনকে (লেখাপড়ার মতো বিষয়) স্থগিত বা বাতিল করেনি—যা বর্তমান সরকার বহু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে করেছে। অপরাধ করলে সে সাজা পাবে, কিন্তু তার অর্জিত একাডেমিক সার্টিফিকেট বাতিল—এটি পৃথিবীর বুকে বিরল শাস্তি, যা আমরা দেখতে পেয়েছি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে।
রাজশাহীর মাসুদ থেকে ওসমান হাদি—কারো হত্যারই সুষ্ঠু বিচার বা অপরাধীকে সামনে আনতে পারেনি আমাদের আন্তর্জাতিক মানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূলত ক্ষমতায় আসে ২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের কোটা-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে, এক প্রকার কয়েক হাজার লাশের মাধ্যমে। কিন্তু আপসোস, এই সরকার সেই হত্যাগুলোরও সঠিক তথ্য-প্রমাণসহ বিচার করতে পারেনি। আন্দোলন চরম আকার ধারণ করেছিল আবু সাঈদ ও মুগ্ধ হত্যার মাধ্যমে। আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে একজন পুলিশ রাবার বুলেট দিয়ে গুলি করে। অবশ্য ওই পুলিশকে আওয়ামী লীগ সরকারই চাকরি থেকে অব্যাহতি ও হাজতে নিয়েছিল। কিন্তু মুগ্ধ হত্যার শিকার হয় স্নাইপার বুলেটে—এটি স্পষ্ট। আন্দোলনে অনেক স্নাইপার ব্যবহার হয়েছে বলে আমরা শুনেছি, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮ মাসেও এই স্নাইপার ব্যবহারকারীদের পরিচয় স্পষ্ট করে জনগণকে জানাতে পারেনি। অর্থাৎ যাদের রক্তের ওপর দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের হত্যারও সুষ্ঠু বিচার করতে পারেননি।
কিছুদিন পরে জাতিসংঘের একটি অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেন—বাংলাদেশে যা হয়েছে (অভ্যুত্থানকে ঘিরে কয়েক হাজার মানুষের জীবন গেছে, শত শত মানুষ আহত হয়েছে)—তা নাকি ছিল “মেটিকুলাস ডিজাইনের” একটি অংশ। অর্থাৎ যত হত্যা হয়েছে জুলাই-আগস্টে, তা একটি পরিকল্পনার অংশ, এবং সেই পরিকল্পনা ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় করা।
একটি নির্বাচন দিতে পেরেছে, কিন্তু তাতেও বহু প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সরকার করেনি; বরং যা করেছে, সেখানেও ২১%+ জাল ভোট প্রদান করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি।
মোটাদাগে বলতে গেলে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র, যেখানে মানুষের জান-মালের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাষ্ট্রপরিচালনায় সফল নয়, বরং ব্যর্থ সরকার হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তিনি মিডিয়ার সামনে যা বলেন, বাস্তবে ঘটে তার বিপরীত।
তবে এই সরকারের কিছু উন্নয়ন আছে, তবে তা গ্রামীণ ব্যাংককেন্দ্রিক। যেমন ২০২৯ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ, প্রধান উপদেষ্টার ৬৬৬ কোটি টাকার কর মওকুফ, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, গ্রামীণ জনশক্তি রপ্তানির অনুমোদন, ডিজিটাল গ্রামীণ লেনদেনের অনুমোদন, গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারের শেয়ারের পরিমাণ কমানো—সহ যা উন্নয়ন হয়েছে, তা সবই গ্রামীণ ব্যাংককেন্দ্রিক। আর জনগণ শুনেছে বুকভরা প্রেজেন্টেশন। তিনি কর দেবেন না, কিন্তু আমাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর নিয়ে উচ্চ মূল্যে আমেরিকা থেকে পণ্য ক্রয় করতে হবে—এটাই তার নিয়ম।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের কার্যকারিতা নিয়ে ১৮ মাস লিখলেও শেষ হবে না তাদের দেশদ্রোহী কাজের হিসাব। যেমন বন্দর পর্যন্ত লিজ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—এমন হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে।
লেখায়,
মোঃ খাইরুল ইসলাম,(ছাত্রনেতা ও সমাজকর্মী)
Leave a Reply