যে মা দিবসের সকালটিতে ঘর ভরে ওঠার কথা ছিল মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা আর সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহের রঙে—সে ঘরই বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে রক্তের দাগে। গত ১০ মে রোববার মা দিবসে ফেনীর দাগনভূঞায় ঘটে গেছে এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনা; যা কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাদক কেনার টাকা না পেয়ে রাফি নামের এক যুবক নিজের মা লাকি বেগমকে কুপিয়ে হত্যা করে। মাকে বাঁচাতে গেলে গুরুতর আহত হন বাবা মোস্তফা ও বোন মিথিলা। এ ঘটনার পর ফেনীর দাগনভূঞা থেকে শুরু করে পুরো দেশজুড়ে নেমে আসে শোক আর বিস্ময়। মাদক কতটা ভয়ংকরভাবে একটি পরিবার, একটি জীবন এবং মানবিকতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে সেটা চিন্তা করে আঁতকে ওঠে দেশবাসী।
শুধু ফেনী নয়; গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় মাদকের টাকা না পেয়ে মা, বাবা, স্ত্রী, খালা কিংবা শিশু হত্যার একাধিক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তি, নেশার টাকা জোগাড়ের চাপ, মানসিক অস্থিরতা এবং পারিবারিক কলহ এসব হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হয়ে উঠছে।
এর মধ্যে গত ১৬ মে সাতক্ষীরার ভোমরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীদাড়ি গ্রামে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাছলিমা খাতুনকে গলা কেটে হত্যা করে স্বামী সাদ্দাম হোসেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত সাদ্দাম নেশার টাকার জন্য প্রায়ই স্ত্রীকে নির্যাতন করত। ঘটনার রাতে টাকা না পেয়ে পাশের ঘরে সন্তান ও মা থাকা অবস্থাতেই স্ত্রীকে হত্যা করে পালিয়ে যায় সে।
কুমিল্লার বুড়িচং বাজারে গত ১৩ মে ঘটে আরেক নৃশংসতা। মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি এনামুল হক শিশিরের হাত-পা বেঁধে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারই সহযোগীরা। পরে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।
নাটোরের বড়াইগ্রামে ৫০০ টাকা না পেয়ে মাদকাসক্ত ছেলে রাজনের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান মা সাজেদা বেগম। টাঙ্গাইলে নেশা ও জুয়ার টাকার জন্য স্ত্রী নাজমা হরিজনের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্বামীর বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে নেশার টাকার জোগান দিতে চার বছরের শিশু মরিয়মকে শ্বাসরোধে হত্যা করে দুই কিশোর। শিশুটির গলার স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নিতে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক এমন ঘটনায় এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পরিবারগুলোয়। মাদকের নেশা যেন ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে মানবিকতা, ভেঙে দিচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় সেই পরিবারকেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সমাজে ছড়িয়ে পড়া মাদকের ভয়াবহতার বহিঃপ্রকাশ। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইয়াবা, গাঁজা, আইস ও বিভিন্ন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার তরুণদের আচরণে ভয়াবহ পরিবর্তন আনছে। দীর্ঘমেয়াদি আসক্তি তাদের সহিংস, অসংযত ও মানবিকবোধহীন করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে যায়। নেশার চাহিদা পূরণ না হলে তারা চরম আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। পরিবার তখন তাদের কাছে সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।’
তিনি বলেন, ‘এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সামাজিক ভাঙনেরও ইঙ্গিত। পরিবারে যোগাযোগ কমে যাওয়া, বেকারত্ব, হতাশা এবং সহজলভ্য মাদক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করছে। এখনই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে পারিবারিক সহিংসতা আরও বাড়বে।’
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের বিপথগামী হওয়ার পেছনে মূল কারণটাই হচ্ছে তাদের আমরা প্রাথমিক শিক্ষাটা অর্থাৎ গৃহ শিক্ষাটা দিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘সংসারে বাবা-মাকেও আদর্শবান হতে হবে। শিক্ষককে হতে হবে শিক্ষাগুরু। আমাদের সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধের অভাবটার কারণেই আজ সমাজে এত কিছু ঘটছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি পারিবারিক সৌহার্দও বাড়িয়ে তুলতে হবে। তাহলে মাদকের কারণে এসব পারিবারিক সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ‘মাদক নির্মূলে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছি। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় মাদকবিরোধী প্রচারণাসহ সবাইকে সতর্ক করছি। সবার মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমাদের এই মাদকের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ করতে পারবে।
লেখায়,
শেখ সবুজ আহমেদ
সম্পাদক,ইনভেস্টিগেশন নিউজ
Leave a Reply