নিজস্ব প্রতিবেদক:
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল চত্বরে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ সোহাগ হত্যার পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এজাহারভুক্ত আসামিদের ১১ জন এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের মধ্যে চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক সদস্য সারোয়ার হোসেন টিটু এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী বলে দাবি নিহতের স্বজনের। তারা বলছেন, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পরও টিটুকে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। মাসখানেক আগে তিনি নিজের বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে যান।
পলাতক আসামিদের মধ্যে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কৃত অন্তত চার নেতাকর্মী রয়েছেন। তারা হলেন– যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবাহ করিম লাকি, চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব অপু দাস এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু। হত্যায় জড়িত সবাই বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। নিহত সোহাগও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সোহাগের স্বজনরা বলছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করছে না। প্রথম দিকে তৎপরতা দেখালেও এখন আসামি গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পুলিশ গড়িমসি করছে।
জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান ইনভেস্টিগেশন নিউজ কে বলেন, এ পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন এজাহারভুক্ত ও ছয়জন তদন্তে শনাক্ত হওয়া আসামি। গ্রেপ্তার ৯ জন অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জড়িত আরও দু-তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত ৯ জুলাই সন্ধ্যায় সোহাগকে মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনের দোকান থেকে আটক করে হত্যায় জড়িতরা। এরপর তাঁকে মারতে মারতে মিটফোর্ড হাসপাতাল চত্বরে নেওয়া হয়। সেখানে ইট ও কংক্রিটের টুকরোর আঘাতে হত্যার পর তাঁর মৃতদেহ টেনে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের সামনের রাস্তায়। এরপর মৃতদেহের ওপর লাফালাফি করে দুর্বৃত্তরা।
নিহত সোহাগের স্ত্রী লাকী বেগম ইনভেস্টিগেশন নিউজ কে বলেন, হত্যার পরিকল্পনাকারী টিটুসহ অনেক আসামি এখনও ধরা পড়েনি। এ কারণে সব সময় ভয়ে থাকতে হয়। তারা আমার বা সন্তানদের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে। তা ছাড়া এখন তদন্তে পুলিশের আর আগ্রহ নেই। আগে তারা আসামিদের গ্রেপ্তারে আন্তরিক ছিল। এখন আর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
সোহাগের গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরে। তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলে সোহান চতুর্থ শ্রেণি ও ১৪ বছর বয়সী মেয়ে সোহানা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায়।
সোহাগ হত্যার ঘটনায় তাঁর বোন মঞ্জুয়ারা বেগম ১৯ জনের নামসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫-২০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। সেই ১৯ জনের মধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন– মাহমুদুল হাসান মহিন, টিটন গাজী, মো. আলমগীর, মো. মনির ওরফে লম্বা মনির, তারেক রহমান রবিন, সজীব বেপারি, রাজীব বেপারি ও নান্নু কাজী। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পেয়ে পুলিশ আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন– রিজওয়ান উদ্দীন ওরফে অভিজিৎ বসু, জহিরুল ইসলাম, মো. পারভেজ, মো. সাগর, রুমান বেপারি ও আবির হোসেন। তাদের মধ্যে মহিন, রবিন, মনির, আলমগীর, টিটন, সজীব, নান্নু, রিজওয়ান ও জহিরুল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
মহিন জবানবন্দিতে দাবি করেন, টিটুর সঙ্গে সোহাগের ব্যবসা নিয়ে বিরোধ চলছিল। এর জেরে টিটুর পরিকল্পনা ও নির্দেশে তিনিসহ অন্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে সোহাগ ভাঙাড়ি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। টিটু ও তিনি ছিলেন বঞ্চিত। ৫ আগস্টের পর তারা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। ব্যবসা ছাড়ার জন্য সোহাগকে বিভিন্ন সময় চাপ দেওয়া হয়। ঘটনার দিনও তারা ব্যবসা ছাড়ার জন্য হুমকি দিতে গিয়েছিলেন। তখন তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হন সোহাগ। এক পর্যায়ে তারা তাঁকে মারধর শুরু করেন।
পুলিশ বলছে, ভাঙাড়ি ব্যবসার দখল নিয়ে বিরোধে সোহাগকে হত্যা করা হয়। এর সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো যোগসূত্র নেই। তবে নিহতের স্বজনরা বলছেন, মহিন ব্যবসার অর্ধেক ভাগের পাশাপাশি মাসে দুই লাখ টাকা চাঁদাও দাবি করেছিলেন।
Leave a Reply