বিশেষ সংবাদদাতা,ঢাকা:
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল হলো চাঁদপুর জেলা। এবং এটি ইলিশের শহর নামে পরিচিত, কারণ এখানকার মেঘনা নদীর ইলিশ মাছ দেশজুড়ে বিখ্যাত। এই জেলার অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে নদীবন্দর, ইলিশ মাছের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র, এবং কৃষি।
এই জেলার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হলেও দীর্ঘদিন জনদুর্ভোগের বিশেষ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাসড়কসহ জেলার বিভিন্ন সড়ক গুলো। এখানকার মানুষের জীবনমানে উন্নয়ন হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে শুধু তারা পিছিয়ে আছে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায়। তবে প্রত্যেক অর্থবছরে এই জেলাতে সড়ক উন্নয়নের জন্য মোটা অংকের বাজেট পাস হলেও সড়ক উন্নয়নে নেই কোন অগ্রগতি। কিন্তু খাতা কলমে কাজ দেখালেও সরজমিনে গিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন চিত্র। এখনো মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে খানাখন্দে ভরা, জনদুর্ভোগে অতিষ্ট সাধারণ জনগণ।
বর্তমান চাঁদপুর সড়ক বিভাগের অধীনে বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলমান আছে কিন্তু প্রত্যেকটা প্রকল্প নিয়েই জনমনে উঠেছে প্রশ্ন। প্রকল্প গুলোর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লা-লালমাই-চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর-বেগমগঞ্জ (আর-১৪০) সড়কের বাকিলা বাজার থেকে বাগাদি চৌরাস্তা পর্যন্ত ১৬.১৭৮ কিলোমিটার অংশে রক্ষণাবেক্ষণের একটি কাজ। জানা যায়, ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটির কাজ পেয়েছে এম/এস শহীদ ব্রাদার্স-এম/এস ওকে এন্টারপ্রাইজ জেভি, যার মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এই প্রকল্পের কাজটি করছে স্থানীয় ঠিকাদার ফারুখ মিদ্দা। কিন্তু চাঁদপুর সড়ক বিভাগের সরকারি প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান ও স্থানীয় ঠিকাদার ফারুখ মিদ্দা যোগসূত্রে এ সমস্ত কাজে অভিজ্ঞ নেই এমন লোক এবং ঠিকাদারের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে, সরকারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সড়ক মেরামতের কাজ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে রাতের আঁধারে সরাসরি কার্পেটিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয়রা “ইনভেস্টিগেশন নিউজ”কে বলেন, প্রকল্পের আওতায় গর্ত মেরামত, ড্রেন নির্মাণ ও কার্পেটিংয়ের কাজ নির্ধারিত থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ মেরামতের কাজগুলো কার্যত উপেক্ষিত। শুধুমাত্র বাকিলা ও ওয়্যারলেস বাজারে ১১২ মিটার অংশে নিম্নমানের পাথর ও বালু মিশ্রিত সামগ্রী দিয়ে নামমাত্র ৩ ইঞ্চি পুরুত্বের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা নির্ধারিত ৬ ইঞ্চি পুরুত্বের ২ লেয়ার রিপেয়ার কাজের চেয়ে অনেক কম। এই অনিয়মের সঙ্গে সওজের সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান (চাঁদপুর) এবং সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কুমিল্লা জোন, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, চাঁদপুর) সরাসরি জড়িত। এই কর্মকর্তারা ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে একটি গাড়িও উপহার দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আরো জানা যায়, ঠিকাদার তার নিজস্ব বা লিজকৃত কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে সওজের যান্ত্রিক বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলীর যোগসাজশে গত চার মাস ধরে সরকারি রোলার, পেলোডার সহ ৫টি গাড়ি কোনো প্রকার রাজস্ব ছাড়া হরহামেশা ব্যবহার করছেন। সাইটে ল্যাবরেটরি বা সার্ভে ইকুইপমেন্টও স্থাপন করা হয়নি, যা কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সাধারণ জনগণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাঁদপুর জেলা নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জানান, মেরামত ছাড়া সরাসরি কার্পেটিং করলে সড়কটি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা সরকারি তহবিলের চরম অপচয়। নির্ধারিত সময়ে অবশিষ্ট কাজ শেষ করা অসম্ভব জেনেও ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অসম্পূর্ণ কাজের বিল ভাগ-ভাটোয়ারা করে তুলে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। এবং এই সরকারি অর্থ লুটপাটের পায়তারার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত কর্মকর্তা-ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি আমরা।
চাঁদপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে ম্যানেজ করে তার এ সমস্ত দুর্নীতির কর্মকাণ্ড চলমান রেখেছে এবং জেলার কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদার, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং অফিসের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে বিশাল বড় একটি সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ হয় চাঁদপুর সড়ক বিভাগের সমস্ত প্রকল্পের কাজ। তবে এ বিষয়ে “ইনভেস্টিগেশন নিউজ”কে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ সমস্ত তথ্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
মোস্তাফিজুর রহমানের এসমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে চাঁদপুর জেলা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ অলিউল হোসেনের কাছে মোবাইল ফোনে বিস্তারিত জানতে চাইলে “ইনভেস্টিগেশন নিউজ” এর কথা শুনে বলে নামাজে আছি এই বলে ফোনটি কেটে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
Leave a Reply