নিজস্ব প্রতিবেদক:
নদীর ভাঙ্গা-গড়ার মত যেখানে রাজনৈতিক স্রোত বহমান সবুজ প্রান্তরের মধ্যেই যেখানে মিশে আছে সম্ভাবনা আর সংস্কৃতির গল্প সেই কুষ্টিয়ার কথায় বলছি। কুষ্টিয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে রয়েছে এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পদের নেতৃত্ব দিয়েছে এই জেলা’ই সন্তান কুষ্টিয়া- ৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় পরপর দুইবার তথ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছে মহাজটের অন্যতম শরিক-দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর সভাপতি কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু।
গত ২০২৪ সালের ৫-ই আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর থেকেই আত্মগোপনে চলে যায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তবে আত্মগোপনে থেকেও অনলাইন ভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেখা যায় দলটির বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতাদের। কিন্তু তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী-দল (বিএনপি) নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে জয় বাংলার মিছিল ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দলীয় কার্যালয় খুলতে থাকে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, টেলিগ্রাম গ্রুপ এর মাধ্যমে আত্মগোপনে থাকা কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দরা উপজেলা,জেলা,মহানগর পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দলীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছে এবং মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি, সাংগঠনিক অদক্ষ, দলীয় কার্যক্রমে অনীহা এমন বিশেষ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নতুন কমিটি গঠন করা সহ এমন অনলাইন ভিত্তিক দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দরা। এরই ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী যুবলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং নতুন কমিটি গঠন বা অনুমতি দেয় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ এর কেন্দ্রীয় কমিটি।
গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ এর প্যাডে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোঃ মাইনুল হোসেন খান নিখিল স্বাক্ষরিত ১০১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটির অনুমতি দেয়া হয়। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এই কমিটিতে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দেখা যায় মীর সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ হারুন অর রশিদ’কে। কিন্তু এই কমিটিকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগের সিংহভাগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ হিসেবে যুবলীগের বিভিন্ন কর্মীরা অভিযোগ তুলেছে, সাইফুল ও হারুন এর থেকেও বর্ষীয়ান ও বিজ্ঞ নেতাদেরকে বাদ দিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুষ্টিয়া শহরে বসবাসরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবলীগ কর্মী সাইফুল ও হারুন সহ কমিটিতে থাকা একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গত ২০২৪ সালের ৫-ই আগস্টের আগে ও পরে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছে। এ বিষয়ে শওকত হোসেন নামে এক যুবলীগ কর্মী “ইনভেস্টিগেশন নিউজ”কে বলেন, নতুন কমিটিতে ক্রীড়া সম্পাদক পদে থাকা ইব্রাহিম খলিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র পক্ষে নির্বাচনী ক্যাম্পিং সহ ধানের শীষে ভোট চেয়েছে যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো আছে। এবং কমিটিতে থাকা ১০১ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই ২০২৪ সালের ৫-ই আগস্টের পরে কেউ বিএনপিতে, কেউ ইসলামী আন্দোলনে, কেউ জামাতে প্রকাশ্যে বা গোপনে যোগ দিয়েছে। যে হাইব্রিডদের কারণে আজ দলের এই অবস্থা, সেই হাইব্রিডদেরকে দিয়েই আবার নতুন কমিটি করা হলো। এতে করে দলের প্রতি সাধারণ কর্মীদের আস্থা ক্ষুন্ন হয়েছে। কারণ দল-ক্ষমতায় থাকাকালীন সাধারণ কর্মীদেরকে মূল্যায়ন করেনি এবং দলের এই দুঃসময়ে যে সমস্ত ত্যাগী কর্মীরা এখনো হামলা,মামলা, নির্যাতন সহ্য করে দলের পাশে আছে তাদেরকে মূল্যায়ন না করলে বা তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু না দিলে দলের আন্দোলন,সংগ্রামে তাদেরকে পাশে পাওয়াটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে একসময়।
এ বিষয়ে সদ্য গঠিত কমিটির সভাপতি মীর সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ হারুন আর রশিদ এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তা সম্ভব হয়নি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এর ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে কমিটিতে থাকা ১০১ সদস্যদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগে সক্ষম হয় “ইনভেস্টিগেশন নিউজ” কিন্তু কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তারা উল্টো প্রতিবেদক’কে প্রশ্ন করে “আমি তো এখন আওয়ামী লীগ করি না, কিভাবে কমিটিতে আমার নাম আসলো”।
কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন কর্মকান্ড ও যাচাই-বাছাই না করে জেলা আওয়ামী যুবলীগের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনে ত্যাগী কর্মীদেরকে বাদ দিয়ে এমন অদক্ষ কর্মীদেরকে দিয়ে কমিটি গঠন করায় জেলা জুড়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই অন্যতম অঙ্গ সংগঠনটি। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী যুবলীগের সদ্যবিলুপ্ত হওয়া কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল ইসলাম স্বপন “ইনভেস্টিগেশন নিউজ”কে বলেন, নতুন কমিটিকে অভিনন্দন জানাই কিন্তু এই মুহূর্তে এই কমিটি না দেওয়াটাই ভালো ছিল। কারণ এখন দলের দুঃসময় আমাদের নেতাকর্মীরা সবাই মামলা-হামলায় জর্জরিত। তবুও যারা আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ, শত হামলা, মামলার মাঝেও যারা এখনো দলের পাশে আছে তাদেরকে এই কমিটি থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। ১০১সদস্য বিশিষ্ট কমিটি দিয়েছে আমরা সাধুবাদ জানাই কিন্তু কমিটি দেওয়ার আগে প্রত্যেকটা সদস্যের বিষয়ে ভালোভাবে জানার প্রয়োজন ছিল ২০২৪ সালের ৫-ই আগস্টের পর তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কি…?
এই সময়ে নতুন কমিটি দেওয়া মানে আমি মনে করি আমাদের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। যে হাইব্রিডদের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সহ তার অঙ্গ সংগঠনগুলো ভেতরে ভেতরে ধ্বংস হয়েছিল। যাদের কারণে একদল সন্ত্রাসী ও দেশদ্রোহীদের কাছে পরাজয় হতে হলো, এখন আবার সেই সমস্ত হাইব্রিডদেরকে দিয়েই দল সাজানো হচ্ছে। এতে করে দলের ত্যাগী কর্মীরা দল থেকে মুখ সরিয়ে নিবে। ৫-ই আগস্টের পর থেকে আমাদের এক একজন কর্মীদের দিন যাচ্ছে জাহান্নামের মধ্য দিয়ে। আর সুবিধাবাদীদেরকে দিয়ে কমিটি গঠন করা হচ্ছে এতে করে কি হবে সামনের দিনগুলোতে তা বোঝা যাচ্ছে। আমরা আওয়ামী লীগের নিবেদিত কর্মী আমরা কোন সুবিধাবাদী নই, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলাম, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছি, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবো,জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু।
Leave a Reply