বিশেষ সংবাদদাতা:
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে দেশের কারাগার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা যে হারে বাড়ছে, তা গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই অন্তত ১০৭ জন ব্যক্তি কাস্টডি বা কারাগার হেফাজতে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৬৯ জন ছিলেন বিচারাধীন (Under-trial) বন্দী এবং ৩৮ জন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে। রিপোর্টগুলোতে দেখা যায়, বহু মৃত্যুর ক্ষেত্রে “অসুস্থতা”কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও চিকিৎসা অবহেলা, চিকিৎসা পেতে বিলম্ব এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাব একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। কিছু ঘটনায় অসুস্থতার কারণ ছাড়াও হেফাজতে থাকা অবস্থায় শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। এতে প্রশ্ন জাগে—এসব মৃত্যু কি প্রকৃত অর্থেই স্বাভাবিক, নাকি এর পেছনে রয়েছে গুরুতর প্রশাসনিক অবহেলা কিংবা আরও গভীর কোনো সংকট? স্বাধীন মানবাধিকার পর্যবেক্ষক ও সংবাদ বিশ্লেষণের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ২০২৫ সালের শেষভাগ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের বেশি রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি কারাগার বা কাস্টডিতে মারা গেছেন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, তাদের স্বজনরা গ্রেপ্তারের সময় তুলনামূলকভাবে সুস্থ ছিলেন, কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। অধিকাংশ ঘটনায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হয়নি বলেও তারা দাবি করছেন। কারা বিভাগ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরেই কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। অধিকাংশ কারাগারে চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং জরুরি রোগী রেফারাল ব্যবস্থার ধীরগতির কারণে গুরুতর অসুস্থ বন্দীরা সময়মতো চিকিৎসা পান না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই বা নেওয়ার পথে তাদের মৃত্যু ঘটে।এ প্রেক্ষাপটে নিহত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কয়েকজনের পরিবার ও সচেতন মহল আরও গুরুতর কিছু অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, কারাগারে দেওয়া খাবার ও পানীয় গ্রহণের পর অনেক বন্দীর শারীরিক অবস্থার অস্বাভাবিক অবনতি ঘটেছে। তারা এটিকে কেবল সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে মানতে নারাজ। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক বা ফরেনসিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি, তবুও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে—এই ধরনের সন্দেহকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পরিবার ও সচেতন মহল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কাস্টডি-ডেথ মামলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে খাবার বা পানীয়র মাধ্যমে এমন উপাদান প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা সরাসরি মৃত্যু ঘটায় না, বরং ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে দুর্বল করে তোলে। উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন— অতিরিক্ত মাত্রার Sedative বা Tranquilizer জাতীয় ওষুধ, যা শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম ধীর করে দেয়; Heavy Metal জাতীয় বিষাক্ত উপাদান (যেমন আর্সেনিক, সীসা বা পারদ), যা ধীরে ধীরে লিভার, কিডনি ও হৃদযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে; Organophosphate জাতীয় রাসায়নিক, যা অল্পমাত্রায় শরীরে গেলে বমি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে; এমন কিছু ওষুধ বা উপাদান, যা হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে হঠাৎ গোলযোগ সৃষ্টি করে, ফলে মৃত্যুকে সহজেই “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট” হিসেবে দেখানো যায়। তারা জোর দিয়ে বলছেন, এসব কেবল সন্দেহ ও অভিযোগ; এগুলোর সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র উপায় হলো আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক ও টক্সিকোলজি পরীক্ষা। খাদ্যের নমুনা সংরক্ষণ, মৃতদেহের রক্ত, প্রস্রাব ও টিস্যু স্যাম্পলের রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং স্বচ্ছ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ছাড়া প্রকৃত কারণ জানা অসম্ভব। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চমাত্রার তদন্তের আওতায় পড়া উচিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, হেফাজতে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবন, চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তা কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। নিহতদের পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রধান দাবিগুলো হলো— প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন ও বিচারিক তদন্ত, ময়নাতদন্ত ও মেডিকেল রিপোর্ট প্রকাশ, ফরেনসিক ও টক্সিকোলজি পরীক্ষার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ অডিট। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়—২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কারাগার ও কাস্টডিতে মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত ও মানবাধিকার সংকটের প্রতিফলন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা ও পরিবারগুলোর ধারাবাহিক অভিযোগ এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই থেকেই যায়— এই মৃত্যুগুলো কি কেবল “অসুস্থতায় মৃত্যু” হিসেবে দায় এড়ানোর চেষ্টা? নাকি এটি এমন একটি বাস্তবতা, যেখানে রাষ্ট্র তার হেফাজতে থাকা নাগরিকদের জীবন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে? যতদিন পর্যন্ত স্বাধীন তদন্ত, আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং স্বচ্ছ রিপোর্ট প্রকাশ না হবে, ততদিন পর্যন্ত “ইন্টেরিমের কারাগার: যেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মৃত্যুর নীরব মঞ্চ” এই শিরোনাম শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি গভীর ও অমীমাংসিত মানবাধিকার অভিযোগ হিসেবেই থেকে যাবে।
Leave a Reply