1. shobujsk1990@gmail.com : Sobuj :
April 16, 2026, 12:18 pm
শিরোনাম:
একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের পর বন্ধ সৈয়দ মাসুদ রুমী সেতুর টোল,পুনরায় চালুর ইঙ্গিত হিউম্যান রাইটস অ্যালাইভ এর কমিটি ঘোষণা গোপালগঞ্জ থেকে সরাসরি ঢাকা ট্রেন চালুর দাবি কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগের কমিটি নিয়ে নেতা-কর্মীদের অসন্তোষ, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় কাশিয়ানীতে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে দিশেহারা লাভলী বেগম, থানায় অভিযোগ সাবেক মন্ত্রী কামরুলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের টুঙ্গিপাড়ায় ফিলিং স্টেশনে গ্রাহক ভোগান্তি শীর্ষে স্বাধীনতা দিবস ও কিছু কথা টুঙ্গিপাড়ায় বিষপানের ১১ দিন পর গৃহবধূর মৃত্যু

দুর্গাপূজা: বাঙালির এক মহামিলনোৎসব

  • আপডেটের সময়: Monday, September 29, 2025
  • 462 Time View

শেখ সবুজ আহমেদ,

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসব। হিন্দুপুরাণের, যেমন মার্কণ্ডেয়পুরাণ, মৎস্যপুরাণ, দেবীপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, কালিকাপুরাণ ইত‍্যাদিতে দুর্গাপূজার উপাখ‍্যান বর্ণনা করা আছে। কিন্তু কে এই দুর্গা—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পণ্ডিতদের দ্বারস্থ হতে হয়।
দুর্গা প্রসঙ্গে পণ্ডিতপ্রবর যোগেশচন্দ্র রায় বিদ‍্যানিধি লিখেছেন, ‘যে শক্তি বিশ্বচরাচরে পরিব‍্যাপ্ত হইয়া আছেন, পরমাণু হইতে বিশাল ব্রহ্মাণ্ড—যাহার আদি নাই, যাহার অন্ত নাই, যাহার মধ‍্য নাই‍, যাহা চিন্তার অতীত, যেখানে দিক নাই, কাল নাই, তাহা যে শক্তির প্রকাশ, সেই শক্তিই দুর্গা।

এই শক্তিরূপী দুর্গাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা করেন সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী দশভুজার আকারে। তাঁর সঙ্গে থাকেন দুই পুত্র গণেশ ও কার্তিক এবং দুই কন‍্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতী। অর্থাৎ এক চিরন্তনী পারিবারিক গৃহস্থালি চেতনার প্রতীক।

একসময় এক চালচিত্রের কাঠামোর মধ‍্যে তাঁদের ঠাঁই ছিল। ১৯৩০–এর দশক থেকে এমন একান্নবর্তী প্রতিমাকে পৃথক পৃথক ফ্রেমে স্থানান্তরিত করা শুরু হয়েছিল। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার দরুন একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভাঙতে শুরু করে সেই সময় থেকে।

ফলে সামাজিকভাবে এর প্রভাব পূজার প্রতিমাতেও পড়েছিল বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন।

সনাতনীদের কাছে দুর্গা কন‍্যা হিসেবে প্রতীয়মান। তাই শরতের আগমনী গানে শোনা যায়, ‘যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড়ো কেঁদেছে।/ দেখেছি স্বপন, নারদ বচন, উমা মা মা বলে কেঁদেছে’—এমন বুলি।

আসলে গৌরী বা উমা বা দুর্গা, যে নামেই তাঁকে সম্বোধন করা হোক, সনাতন বাঙালির বিশ্বাস, শরতের এই কয় দিন তাঁদের মেয়ে উমা পুত্রকন‍্যাসহ বাপের বাড়ি আসেন। আর বিজয়া দশমীর দিন মেয়ে শ্বশুরালয়ে ফিরে যান।

অনেক পণ্ডিতের মতে, দেবী দুর্গাকে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বৌদ্ধদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন। বাংলার প্রাজ্ঞপণ্ডিতজন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন, দেবীপূজা বা শক্তিবাদ আসলে বৌদ্ধধর্মেরই একটি পরিণতি।

আবার প্রখ‍্যাত জার্মান দার্শনিক ম‍্যাক্সমুলারের মতে, দুর্গা আদৌ কোনো বৈদিক দেবী নন। তবে বৈদিক যুগে স্ত্রী দেবতার পূজার চলে দুর্গা নামের দেবীর পূজাও হতো।

বঙ্গভূমিতে শরৎকালেই প্রধানত দুর্গাপূজার প্রচলন। অনেকেই একে ‘শারদীয়’ বলে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের কলমে ফুটে ওঠে ‘শারদোৎসব’ কথাটি। শরৎকালের এই উৎসবকে অকালবোধন বলা হয়।

এই অকালবোধন নিয়েও মতানৈক্য আছে। কালিকাপুরাণে আছে, ব্রহ্মা রাত্রিবেলা দুর্গাকে বোধন করেছিলেন। এ জন‍্য একে অকালবোধন বলে। তবে জনপ্রিয় কিংবদন্তি হলো রাবণবধের জন‍্য রাম দেবী দুর্গাকে পূজা করে জাগিয়ে বর প্রার্থনা করেছিলেন বলে একে অকালবোধন বলে; যদিও বাল্মীকি রামায়ণে এ কাহিনির বিবৃতি পাওয়া যায় না।

কালিকাপুরাণে আছে, রামের প্রতি অনুগ্রহ ও রাবণবধের জন্য ব্রহ্মা আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে নবমী তিথি পর্যন্ত দেবীর পূজা করেন। নবমীতে রাবণ বধ হলে দশমী তিথিতে বিজয় উৎসব হওয়ার পর দেবীর বিসর্জন করেন।

সাধারণত ষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধন হয়। বোধন অর্থ জাগানো। তবে চিরজাগ্রত ভগবানকে জাগানো নয়, এ বোধন ভক্ত বা সাধকের অন্তরাত্মাকে জাগানো। নিজেকে শুদ্ধ, শান্ত, সমাহিত করে তোলার লক্ষ‍্যে যে প্রার্থনা, তার আবাহন। বেলগাছে দেবীর বোধন হলেও সপ্তমী থেকে নবপত্রিকা বা কলাবউ স্থাপন করা হয়।

কৃষিপ্রধান সভ‍্যতার আদিকালে শস‍্য উৎপাদনের জন‍্য উদ্ভিদ পূজার প্রচলন ছিল। দুর্গাপূজায় যে নয়টি গাছের অংশকে একত্র করে নবপত্রিকার পূজা করা হয়, তা সেই প্রাচীন পৃথ্বী বা উদ্ভিদ পূজারই প্রচলিত ধারা। নয়টি উদ্ভিদ হলো কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান।

অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পুরাণে আছে, এই সন্ধিক্ষণেই রাম দশানন রাবণের মুণ্ডুচ্ছেদ করেছিলেন। এ ছাড়া কোনো কোনো জায়গা বা প্রতিষ্ঠানে দুর্গাপূজার সময় মণ্ডপে কোনো কুমারী বালিকাকে দেবীরূপে পূজা করার রীতি প্রচলিত। ১৯০১ সালে অক্টোবর মাসে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে কুমারী পূজার প্রবর্তন করেন।

সনাতন ধর্মের সব পঞ্জিকাতেই প্রতিবছর স্বর্গ থেকে মর্ত‍্যে আসার ও ফিরে যাওয়ার জন্য দেবীর বাহন কী, তার উল্লেখ থাকে। এ বিষয়ে জনসাধারণের আগ্রহও খুবই লক্ষ করা যায়। সাধারণত চারটি বাহনকেই ঘুরেফিরে দুর্গা ব‍্যবহার করে থাকেন। নৌকা, দোলা, গজ ও ঘোড়া।

এই আসা-যাওয়ায় সমাজের ফললাভ নিয়েও মতবিরোধ আছে। জনশ্রুতি আছে, নৌকায় আগমন ও গমন হলে শস‍্যবৃদ্ধি ঘটে। পাশাপাশি দোলায় এলে ও গেলে মড়ক লাগে। গজের বেলায় ঘটে শস‍্যপূর্ণ বসুন্ধরা এবং ঘোড়ায় এলে–গেলে ছত্রভঙ্গের আশঙ্কা থাকে।

দুর্গাপ্রতিমা রূপায়ণেও ভিন্নতা আছে। তবে প্রচলিত প্রতিমাটি সাধারণত এমন হয়ে থাকে—দেবী স্বয়ং ত্রিনয়না, প্রতিটি চোখ পূর্ণচন্দ্রের মতো। গায়ের রং অতসী ফুলের মতো সোনার বরণ। তিনি ত্রিভঙ্গা, সুচারুদর্শনা ও নবযৌবনসম্পন্না।

তাঁর ১০ হাতে ভিন্ন ভিন্ন দেবতা কর্তৃক প্রদত্ত অস্ত্র থাকে, যেমন ডান দিকের হাতগুলোয় ত্রিশূল (মহাদেব), খড়্গ (ব্রহ্মা), চক্র (বিষ্ণু), গদা (ইন্দ্র), শঙ্খ (বরুণ) আর বাঁ দিকের হাতগুলোয় খেটক (কুবের), অক্ষমালা (ঈশান), পাশ (যম), অঙ্কুশ (অগ্নি) ও কমণ্ডলু (বায়ু)।

এ ছাড়া অনেক জায়গায় আবার ভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রেও সজ্জিত হতে দেখা যায় মহিষাসুরমর্দিনীকে। সেখানে দেবীকে দেখা যায় চক্র, ত্রিশূল, শঙ্খ, বজ্র, গদা, তির-ধনুক, তরবারি, ঘণ্টা, পদ্ম ও সাপ হাতেও। দেবীর পায়ের নিচে ছিন্নমস্তকের মহিষ ও উন্মত্ত অসুর ত্রিশূলবিদ্ধ। দেবীর ডান পা সিংহের পিঠে আর বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল অসুরের কাঁধে।

শারদোৎসবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ‍্য দিক হলো সমাজের সব শ্রেণির মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। শুধু পুরোহিত নয়, সূত্রধর, মালাকার, কুমোর, ময়রা, ঢাকি—সব শ্রেণির মানুষের মিলিত প্রয়াসেই এই মহোৎসব সম্পন্ন হয়ে থাকে।

বারোয়ারি বা সর্বজনীন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মেলা, বিচিত্রানুষ্ঠান ও যাত্রা–থিয়েটারের জমকালো আসর বসে। দল–মত–ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের মিলনস্থল হয়ে ওঠে এই শারদোৎসব।

শেখ সবুজ আহমেদ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2026 S.S Media Limited
Theme Customized By Unkwon